ভূমিকা→ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম বাংলা তথা বাংলাদেশের নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে সংগঠিত নবজাগরণ বা রেনেসাঁস এর অন্যতম প্রধান পীঠস্থান ছিল বাংলা। রাজা রামমোহন রায়, ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ডিরোজিয়ো প্রমুখগণ ছিলেন সেই নবজাগরণের ধারক ও বাহক।

নবজাগরণ→ 

নবজাগরণ তার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো রেনেসাঁস হলো একটি ফরাসি শব্দ। ষোড়শ সপ্তদশ শতকে ইউরোপে শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন সূচিত হয় তাই ছিল নবজাগরণ। উনিশ শতকে বাংলায় শিক্ষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটেছিল তাকে অনেকেই নবজাগরণ বলে উল্লেখ করেছেন।

নবজাগরণের শ্রষ্ঠা→

ভারত তথা বাংলার নবজাগরণের স্রষ্টা ছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বাদী প্রবক্তাগণ। সনাতন হিন্দু ঐতিহ্য বিশ্বাসী মনীষী গণ যেমনভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষা সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন ঠিক তেমনভাবে পাশ্চাত্যবাদী গণও উপলব্ধি করেছিলেন প্রাচ্যের সংস্কৃত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা। উভয় গোষ্ঠী বুঝেছিলেন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন দ্বারাই ভারতীয় দের সু-সভ‍্য গড়ে তোলা যাবে।

নবজাগরণের প্রকৃতি→

উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি নিয়ে ভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে।

(1) তৎকালীন সামাজিক পরিস্থিতিতে রামমোহন রায় এক চিঠিতে আলেকজান্ডার ডাফ কে লিখেছিলেন "আমি ভাবতে শুরু করেছি যে ইউরোপের রেনেসাঁর মতো কিছু একটা ভারতেও ঘটতে চলেছে"। রামমোহনের মতোই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কেশব চন্দ্র সেন, বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখ গণ উনিশ শতকের বাংলায় মানসিক ও সামাজিক স্ফুরণকে নবজাগরণ বলেই আখ্যা দিয়েছেন।

(2) ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার তার 'হিস্টি অফ বেঙ্গল গ্রন্থে' বাংলাকে নবজাগরণের পীঠস্থান বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন কনস্ট‍্যান্টি নোপোল পতনের পর যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল উনিশ শতকের বাংলাতেও তিনি সেই অবস্থা লক্ষ করছেন। তার মতে বাংলার নবজাগরণ ছিল অনেক বেশি গভীর এবং বৈপ্লবিক।

(3) অধ্যাপক সুসোভন সরকার বলেছেন। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ব্রিটিশ শাসনের বুর্জুয়া অর্থনীতি ও আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব অনুভব হয়।

বাংলা নবজাগরণ প্রকৃত নবজাগরণ নয়→

 প্রখ্যাত পন্ডিত অশোক মিত্র বাংলা নবজাগরণ কে 'তথাকথিত' নবজাগরণ বলেছেন। তার মধ্যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবাদে নয়া জমিদার শ্রেণীর রায়ত দের শোষণ করে যে বিপুল অর্থ লাভ করেছিল, তার একটা বিরাট অংশ তারা কলকাতার সংস্কৃতি কর্মকাণ্ডে ব্যয় করেন। ফলে সেখানে সাধারণ মানুষের কোনো যোগ ছিল না।

                  গবেষক সুপ্রকাশ রায় বলেছেন- বাংলার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আন্দোলনের প্রকৃত ছিল ইউরোপের আন্দোলনের থেকে অনেক ভিন্ন ও বিপরীতমুখী।

 নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা→

 (i) উনবিংশ শতকে বাংলার নবজাগরণ ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক সাধারন মানুষের একটা বড় অংশ নবজাগরণে যোগ দেয়নি।

(ii) ইতালির ফ্লোরেন্স নগরী ইউরোপের নবজাগরণে যে ভূমিকা পালন করেছিল কলকাতার তা করতে পারেনি। কলকাতা ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক কেন্দ্র।

নবজাগরণের গুরুত্ব→

উনিশ শতকে নবজাগরণের ফলে, ভারতীয়রা পাশ্চাত্য জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পায়। ভারতীয়দের কাছে এর আগে এই ধারণা স্পষ্ট ছিল না। নবজাগরণের ফলেই ভারতীয় সামাজ মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ পদার্পণ করে।