ভারতের সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় ইংল্যান্ডের মডেল অনুসরণ করা হয়েছে। ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট চরম সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। ভারতের সংসদ ইংল্যান্ডের সংসদের মতোই ক্ষমতার অধিকারী; এক কথায় বলা যেতে পারে যে, ইংল্যান্ডের সংসদের প্রতিরূপ হলো ভারতের পার্লামেন্ট।
গঠন
আমাদের পার্লামেন্ট লোকসভা, রাজ্যসভা ও রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে গঠিত। ভারতের লোকসভার সদস্য সংখ্যা সাধারণত ৫৪৫ জন। ইংল্যান্ডের অনুকরণে ভারতের পার্লামেন্ট সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। লোকসভা গঠিত হয় জনগণের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে। লোকসভার কার্যকাল পাঁচ বছর। রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনে লোকসভা ভেঙে দিতে পারেন। লোকসভার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার।
কার্যাবলী
ভারতের পার্লামেন্টের ক্ষমতা অত্যন্ত বিস্তৃত। সংবিধানের ৭৫(৩), ২৬৫, ২৬৬ প্রভৃতি ধারায় পার্লামেন্টের ক্ষমতা ও কার্যাবলী বর্ণিত হয়েছে। পার্লামেন্টের কার্যাবলী নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
শাসন ক্ষমতা
প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা রাষ্ট্রপতির দ্বারা নিযুক্ত হন। মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে লোকসভার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত। শাসন সংক্রান্ত সমস্ত ক্ষমতা মূলত লোকসভার হাতে ন্যস্ত এবং প্রধানমন্ত্রী এর চালিকাশক্তি।
আইনি ক্ষমতা
আইন প্রণয়ন পার্লামেন্টের অন্যতম প্রধান কাজ ও দায়িত্ব। আমাদের সংবিধানে তিনটি তালিকা রয়েছে— (১) কেন্দ্র তালিকা, (২) রাজ্য তালিকা ও (৩) যুগ্ম তালিকা। যুগ্ম তালিকা বিষয়েও কেন্দ্র আইন প্রণয়ন করতে পারে। আইন পাশের ক্ষেত্রে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তবে অর্থবিলের ক্ষেত্রে লোকসভা বেশি ক্ষমতা ভোগ করে।
অর্থ সংক্রান্ত ক্ষমতা
২৬৫ ও ২৬৬ ধারায় বলা হয়েছে— ভারতের সংবিধান অনুসারে কর ধার্য, কর সংগ্রহ ও ব্যয় নির্বাহ পার্লামেন্টের আইন ছাড়া করা যাবে না। অর্থ সংক্রান্ত যাবতীয় ক্ষমতা লোকসভার। অর্থবিলের ব্যাপারে রাজ্যসভার কোনো ক্ষমতা নেই। লোকসভায় গৃহীত অর্থবিল রাজ্যসভা সংশোধন বা বাতিল করতে পারে না, কেবল সর্বাধিক ১৪ দিন আটকে রাখতে পারে।
সংবিধান সংশোধন ক্ষমতা
ভারতের পার্লামেন্ট সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজ্যগুলির অনুমোদন প্রয়োজন হলেও বহু ক্ষেত্রে পার্লামেন্ট একাই সংবিধান সংশোধন করতে সক্ষম।
নির্বাচন সংক্রান্ত ক্ষমতা
পার্লামেন্টের সদস্যগণ রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করেন। পাশাপাশি, বিশেষ প্রক্রিয়ায় তাঁদের পদচ্যুত করার ক্ষমতাও পার্লামেন্টের রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রমাণিত অসদাচারণ বা অযোগ্যতার অভিযোগ উঠলে তা বিচার ও অপসারণের ব্যাপারে পার্লামেন্ট প্রস্তাব পাস করতে পারে।
তথ্য সরবরাহ ও আলোচনা
ভারতের লোকসভা হলো মুক্ত আলোচনার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। দেশের নানা সমস্যা ও খবরাখবর এখানে আলোচিত হয়। এই আলোচনার মাধ্যমে জনগণ সরকারের বিভিন্ন কার্যকলাপ ও নীতি সম্পর্কে অবহিত হতে পারে।
মূল্যায়ন
ভারতে ইংল্যান্ডের অনুকরণে সুস্পষ্টভাবে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রকৃত শাসন ক্ষমতা লোকসভার হাতেই থাকে, কারণ এই সভার প্রতিনিধিরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত। তাই ভারতের লোকসভা হলো ভারতীয় গণতন্ত্র ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক।