বাংলা নবজাগরনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান আলোচনা করো

প্রশ্ন

 বাংলা নবজাগরনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান আলোচনা করো।

অথবা

বাংলার সংস্কার আন্দোলনের না এসে চন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা আলোচনা করো

উত্তর

ভূমিকা:-

→ ঔপনিবেশিক শাসনকালে জাতীয় সমাজের অন্তর্বর্তী দূর করে সমাজ সংস্কারের কাজে জীবন উৎসর্গ করেছিল যে কয়েকজন মহাপুরুষ ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রকৃত অর্থে সাধারণ সংস্কৃত পণ্ডিত হয়েও যুক্তিবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মানবতা বোধ এবং পাশ্চাত্য ভাবাদর্শে এক অভূতপূর্ব সম্বন্বয় ঘটেছিল তার মধ্যে। তাই মাইকেল মধুসূদন দত্তের চোখে এমন একজন ব্যক্তি যা সারাজীবন বাঙালির হৃদয়ে অবস্থান করে আছে।

শিক্ষা সংস্কার:-

i) বিদ্যালয় স্থাপন→

 বিদ্যাসাগর বিদ্যালয় স্থাপনের উপর জোর দিয়েছিলেন। 1844 খ্রিস্টাব্দে লর্ড হার্ডিঞ্জ (100টি) বাংলা স্কুল স্থাপন করার পরিকল্পনা করলে বিদ্যাসাগর তার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। বিদ্যাসাগর নিজেও (20টি) মডেল তৈরি করে। তিনি 1872 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট। পরবর্তীকালে এটি বিদ্যাসাগর কলেজে পরিণত হয়।

ii) নারী শিক্ষার প্রসার→

 বিদ্যাসাগরের নারী শিক্ষার প্রসার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। 1844 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় হিন্দু ফিমেল স্কুল প্রতিষ্ঠিত করে। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন জেলায় (35টি) বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। এই বিদ্যালয় গুলিতে প্রায় (1300) ছাত্রী পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিল।

iii) মাতৃভাষার শিক্ষাদান→

 শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত ও মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের উপর জোর দেয়। তবে একই সঙ্গে তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে।

iv) বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক রচনা→

শুধুমাত্র বিদ্যালয় স্থাপন নয়, পাঠ্য পুস্তক রচনার দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেয়। রচনা করেন বর্ণপরিচয়, শিশু শিক্ষা, কথামালা, নীতিবোধ প্রভৃতি। সংস্কৃত সুবিধার জন্য রচনা করেন ব্যাকরণ কৌমুদী গ্রন্থ। এছাড়াও তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো শব্দ মুনজুরি, বোজোবিলাশ, রত্নপরীক্ষা।

সমাজ সংস্কার:-

i) বিধবা বিবাহ→

বিদ্যাসাগরের শ্রেষ্ঠ কৃত্তি ছিল বিধবা বিবাহ। নিজের মুখেই তিনি তা স্বীকার করেছিলেন। এই বিধবা বিবাহের জন্য তিনি দীর্ঘ একটি সংগ্রাম করেন। যার ফলস্বরূপ হয়েছিল 1856 খ্রিস্টাব্দে লর্ড ডালহৌসি কর্তৃক বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়েছিল।

ii) বাল্যবিবাহের বিরোধিতা→

 বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ‘সর্বশুভকরী পত্রিকা’তে প্রথম সংখ্যাতে বাল্যবিবাহের দোষ নামে একটি প্রবন্ধ ও প্রকাশ করে। তিনি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে জোরালো প্রচার করে। যার ফলে ব্রিটিশ সরকার মেয়েদের বিবাহের বয়স সর্বনিম্ন (10 বছর) ধার্য করে দেয়।

iii) বহুবিবাহের বিরোধিতা→ 

সারাজীবন ধরে বিদ্যাসাগর বহুবিবাহের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়। তিনি বর্ধমানে মহারাজার সহায়তায় বহুবিবাহ বিরুদ্ধে (50 হাজার) ব্যাক্তির স্বাক্ষর নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাঠান। কিন্ত মহাবিদ্রোহ শুরু হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি বেশি দূর এগোয়নি।

iv) অন্যান্য সংস্কার→

বিদ্যাসাগর তৎকালীন বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ও সজাগ হন। তিনি সন্তান বিসর্জন, কুষ্ঠরোগী হত্যা, জাতিভেদ প্রথা প্রভৃতি কুপ্রথার বিরুদ্ধে স্বচর হন।

উপসংহার→

 বাংলা তথা ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতায় বিদ্যাসাগরের অবদান অসীম। চিরাচরিত রক্ষণশীল পরিবেশের মানুষ সংস্কৃতির পন্ডিত হওয়া সত্বেও তিনি অতি সহজে পাশ্চাত্য ভাবধারা কে গ্রহণ করেছিলেন। তাই কবি রবীন্দ্রনাথের মতে ‘ভীরু দেশে তিনি ছিলেন এক মাত্র পুরুষ সিংহ’।


Leave a Comment