কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট কিভাবে তৈরি হয়েছিল | এই সংকটে আমেরিকা ও রাশিয়ার ভূমিকা আলোচনা করো

 ভূমিকা→ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঠান্ডা লড়াই আরো একটি  সংকট বিশ্বকে অনধিক যুদ্ধের দিকে এগিয়ে দিয়েছিল কিউবা সংকট। কিউবা হল ক্যারিবিয়ান শহরে অবস্থিত সর্ববৃহৎ দ্বীপ। কিউবাতে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি স্থাপন কে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত সম্পর্কে যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তা কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকট নামে পরিচিত।

পটভূমি→ বিশ্বের সর্বাধিক চিনি উৎপাদন করি রাষ্ট্র কিউবা তে মার্কিন পুঁজিপতি দের একচেটিয়া অধিপত্তের প্রতিষ্ঠান অবসান ও মার্কিন মদতপুষ্ট বাতিস্তা সরকারের পতন হলে কিউবা এক সংঘাতের সৃষ্টি হয়। 

ফিদেল কাস্ত্রোর ভূমিকা→ 1949 খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রো সেখান কার বাতিস্তা সরকারের অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। রাষ্ট্রপতি পদে বসার পর পুজিবাদী আমেরিকার দিক থেকে সরে এসে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলে ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন।

কাস্তের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি→ ফিদেল কাস্ত্রের শাসন কালে প্রথম দিকে কিউবার সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক খারাপ হয়নি। কাস্ত্রো কিউবাতে বেশ কিছু সংস্কার মূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হলে আমেরিকার সঙ্গে কিউবার বিরোধের সূচনা হয়। যেমন-

(ক) কাস্ত্রো কিউবায় আমেরিকার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে।

(খ) রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য সমাজ তান্ত্রিক দেশের সঙ্গে ঘনিষ্টতা স্থাপন করেন।

(গ) রাশিয়া ও অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রচুর আর্থিক সাহায্য লাভ করে।

(ঘ) প্রতিবেশী ডমিনিক্যান হাইতি, লিকারা, গোয়া, ভেনে জুয়েলা প্রভৃতি দেশে মার্কিন বিরোধী আন্দোলন কে উৎসাহিত করে

মার্কিন প্রতিক্রিয়া→ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দ্রুতগামী গুপ্তচর বিমানের ক্যামেরাই তোলা ছবি থেকে জানতে পারে, আমেরিকার দক্ষিণ সীমান্ত থেকে (150) কিমি দূরে কিউবায় সোভিয়েত রাশিয়া ক্ষেপন অস্ত্র ঘাঁটি নির্মাণ করেছেন। এই ঘটনার ফলে মার্কিন রাষ্ট্রপতি কেনেডি 1962(খ্রীঃ) এক বেতার ঘোষণার মাধ্যমে কিউবার চতুর দিকে নৌ-অবরোধ এবং কিউবা গামী সব দেশের জাহাজ গুলোকে তল্লাশি করা হবে বলে ঘোষণা করেন। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, কিউবা থেকে কোন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলে সোভিয়েত রাশিয়ার উপর পাল্টা আক্রমণ চালাবে।

রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া→ এই ঘটনার এক বছরের মধ্যেয় রাশিয়া কিউবাকে একটি সমাজ তান্ত্রিক দেশ হিসেবে ঘোষণা করে। কিউবাতে রাশিয়া সাহায্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। এমন কি রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রুশ্চেভ ঘোষণা করেন যে , ‘কিউবার সার্বভৌমত্ত রক্ষার জন্য রাশিয়া তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করবে’। এক্ষেত্রে রাশিয়ার দুটি উদ্দেশ্য ছিল-

(ক) কিউবাতে ক্ষেপন অস্ত্র ঘাঁটি নির্মাণ করে আমেরিকাকে চাপিয়ে রাখা।

(খ) 1962 খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া কিউবাতে মিগ-(21 ও 24) টি আনবিক বোমার সরবরাহ করা।

রুশ মার্কিন যুদ্ধ প্রস্তুতি→ কিউবায় রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ কে কেন্দ্র করে সমগ্র আমেরিকা জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। 22 শে অক্টোবর কেনেডি জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে আকাশ ও নৌ-পথে কিউবা অবরোধ ঘোষণা করে। এবং সেনা বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। রুশ নৌ-বহর যাতে কিউবায় পৌঁছাতে না পারে সেজন্য কিউবার বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ জারি করেন।

গুরুত্ব→ প্রায়ই তারা দুই সপ্তাহ ধরে কিউবা কে কেন্দ্র করে সারা বিশ্ব জুড়ে এক অস্বস্তি কর পরিবেশ সৃষ্টি হলেও কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। তবুও বিশ্ব রাজনীতিতে কিউবা সংকটের গুরুত্ব ছিল সুদূর প্রসারী। যেমন-

(i) কিউবা সংকট প্রমাণ করেছিল বিশ্বের যে কোনো সমস্যা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায় এবং এর মধ্যে দিয়ে দাতার রাজনিতির উদ্ভব ঘটে

(ii) দক্ষিণ আমেরিকায় প্রথম সমাজ তান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে কিউবার আত্মপ্রকাশ ঘটে।

উপসংহার→ ঠান্ডা লড়াই যুদ্ধ তথা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে কিউবা সংকট একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই সংকট পৃথিবীকে পরমাণু যুদ্ধের দিকে এগিয়ে দেয়। সৌভাগ্যের বিষয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সংঘর্ষ প্রদর্শন না করে বিশ্ব শান্তি রক্ষা করে। এক্ষেত্রে সোভিয়েত রাশিয়া প্রথম এগিয়ে এসেছিল। কিউবার সমস্যা শেষ পর্যন্ত সমাধান হলেও কিউবার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কিউবায় আর মার্কিন প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ল্যাটিন আমেরিকার একমাত্র দেশ কিউবা সমাজ তান্ত্রিক থাকে।

Leave a Comment