ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ভারতের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার কি রূপ ছিল সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দাও

ভূমিকা→

মোঘল আমলে বাংলা,বিহার,উড়িষ্যা নিয়ে সুবা বাংলা গঠিত হয়েছিল। এখানে কোম্পানির প্রথম রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ভূমি রাজস্ব ছিল আয়ের প্রধান উৎস। ডঃ রজনীপাম দত্ত মনে করেন এদেশের ভূমি রাজস্ব থেকে আধুনিক ইংল্যান্ড অনেকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে।

ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনের মূল উদ্যোক্তা→

1772 খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হন। এবং এই সময় ছিল অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলা দরুন ভাবে বিপদগ্রস্ত। হেস্টিংস সেই সময়কার নায়েব রেজা খাঁ ও সিতাব রায় কে পদচ্যুত করে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটান। এবং ‘বোর্ড অফ রেভিনিউ‘ গঠন করে। তার উপর ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার দায়িত্ব অর্পণ করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এই ব্যবস্থার বিভিন্ন ত্রুটি ধরা পরলে পরবর্তী গভর্নর লর্ড কর্নওয়ালিস নতুন ভূমি ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ভূমি ব্যবস্থা→

 ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুন ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলেন নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো।

(১) পাঠশালা বন্দোবস্ত→

 ওয়ারেন হেস্টিংস 1772 খ্রিস্টাব্দে ‘বোর্ড অফ রেভিনিউ’ ও ভ্রাম্যমাণ কমিটির দ্বারা প্রতিটি জেলায় গিয়ে নিলামের মাধ্যমে পাঁচ বছরের জন্য জমি বন্দোবস্ত করেন। এবং একজন ইংরেজ কালেক্টরকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, এই ব্যবস্থায় ইজারাদারি ব্যবস্থা এবং পাঁচ বছরের জন্য ভূমি বন্দোবস্ত করা হতো বলে এই ব্যবস্থা পাঁচশালা বন্দোবস্ত ব্যবস্থা নামে পরিচিত

(২) একসালা বন্দোবস্ত→

 1777 খ্রিস্টাব্দে পাঁচশালা বন্দোবস্ত এর অবসান ঘটিয়ে ইজারাদারদের খারিজ করে, জমিদারদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। এক বছরের জন্য এই ব্যবস্থা চালু করা হয় বলে, এটি একসালা বন্দোবস্ত নামে পরিচিত

লর্ড কর্নওয়ালিসের ভূমিব্যবস্থা→

 1789 খ্রিস্টাব্দে বাংলা ও বিহারে এবং 1790 খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যায় দশ সালা বন্দোবস্ত চালু হয়। লর্ড কর্নওয়ালিস জন শেরের সুপারিশ গ্রহণ করে, নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে জমিদারদের সঙ্গে দশ বছরের জন্য জমি বন্দোবস্ত করেন। এই ব্যবস্থা দশ সালা বন্দোবস্ত নামে পরিচিত

(১) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত→

 লর্ড কর্ণওয়ালিস প্রথমে যে দশ সালা বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন তা 1793 খ্রিস্টাব্দে ‘বোর্ড অফ ডিরেক্টরের‘ অনুমোদন পেয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত হয়। লর্ড কর্নওয়ালিসের উদ্দেশ্য ছিল, নির্দিষ্ট সময়ে চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট রাজস্বের বিনিময় ভূমি বন্দোবস্ত গড়ে তোলা। জমিদারের সাথে গড়ে ওঠা এই বন্দোবস্ত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে পরিচিত

(২) মহলওয়ারি বন্দোবস্ত→

 উনিশ শতকের গোড়ায় হোল্ড ম্যাকেঞ্জি প্রবর্তন করেন মহলওয়ারি বন্দোবস্ত। এই ব্যবস্থায় কয়টি গ্রাম নিয়ে মহল বা  তালুক সৃষ্টি করে কোনো ব্যক্তি বর্গ কে যৌথভাবে রাজস্ব দেওয়ার শর্তে, ওই মহলের ইজারা দেওয়া হতো। মহল ধরে জমি বন্দোবস্ত করা হতো বলে এই ব্যবস্থা মহলওয়ারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত

(৩) রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত→

 টমাস মনরো ও ক্যাপ্টেন রিড ভারতের মাদ্রাজে কয়েকটি এলাকা বাদে ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে 1820 খ্রিস্টাব্দে এই বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থায় সরকার সরাসরি কৃষকদের সাথে বন্দোবস্ত গড়ে তোলেন। তাই এই বন্দোবস্ত রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত

(৪) ভাইয়াচারী বন্দোবস্ত→

 1824 খ্রিস্টাব্দে এল.ফিন.স্টোন পাঞ্জাবের কয়েকটি গ্রামে ভাইয়াচারী ব্যবস্থা চালু করে। এল.ফিন.স্টোন ও ম্যাকেঞ্জি জনসংখ্যা কম থাকায় এই রূপ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল পাঞ্জাবের কয়েকটি গ্রামে।

                           ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত বিভিন্ন ধরনের ভূমি রাজস্ব নীতি কৃষক ও বাংলার সমাজ ও অর্থনীতিতে নিদারুন প্রভাব ফেলেছিল। বিভিন্ন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার ফলে কোম্পানির অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ ও বাংলার অর্থনীতি একেবারে ভেঙ্গে পড়ে এবং কৃষকের দুর্দশা বৃদ্ধি পায়।

Leave a Comment