চীনের উপর আরোপিত বিভিন্ন অসম চুক্তিগুলি আলোচনা কর

ভূমিকা→

 (1839-1949) খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চীনের কিং বংশের শাসনকালে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান প্রভৃতি বিদেশি শক্তিগুলি তাদের সামরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে চীনকে বিভিন্ন যুদ্ধে পরাজিত করে। সে দেশে অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের প্রসার ঘটায়। এবং চীনের উপর বিভিন্ন শোষণমূলক চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই চুক্তি সাধারণভাবে অসম চুক্তি নামে পরিচিত

বিভিন্ন অসম চুক্তি→

 বিভিন্ন ঐতিহাসিকগণ চীনের ওপর আরোপিত যে সমস্ত অসম চুক্তি গুলি উল্লেখ করেছে তা হল নিম্নরূপ।

(১) প্রথম আফিমের যুদ্ধ ও নানকিং চুক্তি→

  1796 খ্রিস্টাব্দে চীন সম্রাট চিয়াং চিং চীনে আফিম ব্যাবহার, আমদানি ও চাষ করা বেআইনি বলে ঘোষণা করলেও বাণিজ্যিক স্বার্থে ইংল্যান্ড বেআইনি ভাবে আফিম বাণিজ্য চালিয়ে যেতে থাকে। ফলে 1840 খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড ও চীনের মধ্যে প্রথম আফিম যুদ্ধ হয়। চীন পরাজিত হয়ে 1842 খ্রিস্টাব্দে নানকিং চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির শর্ত দ্বারা-

(ক) চীন হংকং বন্দরটি ইংল্যান্ডকে ছেড়ে দেয়। 
(খ) চীনের ক্যান্টন বাজেয়াপ্ত করে।
(গ) কংহং প্রথা বাতিল হয়।

(২) বগের অসম চুক্তি→

 ব্রিটিশ সরকার নানকিং চুক্তির কিছুদিন পরে অর্থাৎ 1843 খ্রিস্টাব্দে চীনের উপর বগের সন্ধি নামে একটি অসম চুক্তি চাপিয়ে দেয়। এই সন্ধি দ্বারা চীনে অবস্থিত ব্রিটিশ নাগরিকদের ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী বিচার করার অধিকার তারা পায়। এর শর্ত গুলি হল- 

(ক) চীন সম্রাট ইংল্যান্ডকে সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেবে।
(খ) চীন অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে যেসব  সুযোগ-সুবিধা দেবে সেগুলি ব্রিটেনকে জানাতে হবে।

(৩) ওয়াং সিয়ার অসম চুক্তি→

 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল চীনের কাছ থেকে বেশকিছু বাণিজ্যিক সুযোগ সুবিধার জন্য 1844 খ্রিস্টাব্দে ওয়াং সিয়ার অসম চুক্তি চাপিয়ে দেয়। এই চুক্তি দ্বারা-

(ক) আমেরিকা ইংল্যান্ডের মতো সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী জাতি হিসাবে ভোগ করবে অধিকার। 
 (খ) চীনে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিকদের অপরাধের বিচার করবেন মার্কিন কনসাল।

(৪) হোয়োম কোয়া এর অসম চুক্তি→

 ফ্রান্স ব্রিটেন মতো বাণিজ্যিক সুযোগ সুবিধা লাভের জন্য 1844 খ্রিস্টাব্দে চীনের ওপর হোয়োম কোয়ার অসম চুক্তি চাপিয়ে দেয়। এই চুক্তির দ্বারা –

(ক) ফরাসি বণিকদের জন্য চীনের নতুন পাঁচটি বন্দর খুলে দেওয়া হয়।
(খ) ফরাসি ও চীনা বণিকদের মধ্যে বাণিজ্যিক শুল্ক স্থির হয়।

(৫) আইগুনের সন্ধি→

1858 খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া চীনকে বাধ্য করেছিল আইগুনের সন্ধি স্বাক্ষর করতে। এই সন্ধির শর্ত ছিল-

(ক)রাশিয়া উত্তর চীনের বেশ কিছু এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। 
(খ) রাশিয়া ও চীনের নৌ চলাচল স্বীকৃত হয় চীনের আমুর উসুরি ও সং খুয়াজিয়াং নদীতে।

(৬) দ্বিতীয় আফিমের যুদ্ধ ও তিয়েনসিনের সন্ধি→

 ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স দ্বিতীয় আফিমের যুদ্ধে চীন কে পরাজিত করে, তিয়েনসিনের চুক্তি চীনের উপর চাপিয়ে দেয়। এই চুক্তির দ্বারা-

(ক) বিদেশীদের কাছে মুক্ত হয় (১১টি) বন্দর।
(খ) বিদেশিরা চীনে অবাধ, ভ্রমন, বসবাস ও খ্রিস্টধর্মের প্রচারের অনুমতি পায়।

(৭) পিকিং এর সন্ধি→

 চীন সম্রাট সিয়েন কিং তিয়েন সিং এর সন্ধি অনুমোদন করলে চীন না মানলে তারা প্রতিশোধ নিতে যৌথবাহিনী 1860 খ্রিস্টাব্দে পিকিং দখল করে নিলে চীন সম্রাট মাঞ্চুরিয়াই পালিয়ে যায়। তখন রাশিয়ার মধ্যস্থতায় চীনে সম্রাটের ভাই কুং ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সঙ্গে পিকিং এর সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। এর শর্তগুলো হলো- 

(ক) তিয়েন সিং বন্দরটি বিদেশের জন্য খুলে দেওয়া হয়। (খ) চীন ৪ মিলিয়ন টাইল ক্ষতিপূরণ দেবে বলে রাজি হয়।

(৮) শিমনোসেকির সন্ধি→

 কোরিয়া কে কেন্দ্র করে চীন ও জাপানের মধ্যে যুদ্ধ হয়। ক্ষুদ্র জাপানের হাতে চীন পরাজিত হয়। 1895 খ্রিস্টাব্দে জাপানের সাথে শিমনোসেকির সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। যার শর্তগুলো হলো-

(ক) কোরিয়া কে চীন স্বাধীনতা দেয় ।
(খ) চীনের কাছ থেকে জাপান তায়ওয়াং, পোর্ট আর্থার লাভ করে।

মূল্যায়ন→

 অসম চুক্তি গুলির মাধ্যমে ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা, রাশিয়া যে সুযোগ সুবিধা লাভ করেছিল তা 1946 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বজায় ছিল। তবে 1917 খ্রিস্টাব্দে রুশ বিপ্লব কালে চীনের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করে। অনুরূপভাবে ব্রিটেন 1997 খ্রিস্টাব্দে ম্যাকাও বন্দরের উপর তাদের দাবি ত্যাগ করে।


Leave a Comment