সিন্ধু সভ্যতার সমস্যা

সিন্ধু সভ্যতার সমস্যা [The Problem of the Harappan Civilisation]: 

সিন্ধু সভ্যতাকে কেন্দ্র করে চারটি সমস্যা আছে- (১) বিস্তৃতি,  (২) নির্মাতা,  (৩) সময়সীমা এবং  (৪) অবলুপ্তি ও ধ্বংসের কারণ । এর মধ্যে প্রথমটি ছাড়া বাকি সমস্যাগুলির সমাধান এখনও হয়নি । তিনটি প্রশ্নই অত্যন্ত বিতর্কিত।
প্রথম প্রশ্নটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই, কারণ এ যাবত যেসব কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে তাদের অবস্থান থেকে সিন্ধু সভ্যতার সীমানা সম্পর্কে একটা ধারনা করা যায় । এর অর্থ অবশ্য এটা নয় যে, বর্তমান সীমারেখাই চূড়ান্ত । ভবিষ্যতে নতুন নতুন কেন্দ্র আবিষ্কৃত হলে এই সিমা রেখা অবশ্যই পালটে যাবে ।

(১) সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃতি The Extent of the Harappan Civilisation]:

 এ পর্যন্ত সিন্ধু সভ্যতার যত কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে তার ভিত্তিতে বলা যায় বর্তমান ভারত ও পাকিস্থানের এক বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল । পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান, গুজরাট, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশের পশ্চিম অংশের কিছু অঞ্চল জুড়ে এই সভ্যতা বিস্তার লাভ করেছিল । এই সভ্যতা পশ্চিমে বালুচিস্তানের সুত্‌কাগেন্‌দর থেকে পূর্বে মিরাট জেলার আলমগির পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল (১৬০০ কিমি) । উত্তরে সিমলা পাহাড়ের নীচে রূপার থেকে দক্ষিণে গুজরাটের ভোগাবর পর্যন্ত এলাকা (১১০০ কিমি) এই সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত ছিল । যেহেতু সিন্ধু নদের তীরবর্তী অঞ্চল ছাড়াও আরও বিস্তৃত এলাকা জুড়ে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তাই সিন্ধু সভ্যতা নামটি বর্তমানে অনেকাংশে অপ্রাসঙ্গিক হয়েপড়েছে । তবুও সাধারণ ভাবে এই সভ্যতাকে এখনও আমরা সিন্ধু সভ্যতা বলেই অভিহিত করে থাকি ।

(২) সিন্ধু সভ্যতার নির্মাতা [Founder of the Harappan Civilisation]: 

সিন্ধু সভ্যতা ভারতীয় সভ্যতা, না বিদেশিরা, অর্থাৎ, মেসোপটেমিয়ার জনগণ এই সভ্যতার সৃষ্টিকর্তা, তা নিয়ে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। অন্যদিকে এই সভ্যতা আর্যসৃষ্ট না অনার্যসৃষ্ট, অর্থাৎ, দ্রাবিড়দের তৈরি, তা নিয়েও বিস্তর বিতর্ক আছে । ফাদার হেরাস ও অন্যান্য পন্ডিত সিন্ধু সভ্যতার নির্মাতা হিসাবে দ্রাবিড়দের পক্ষে যেমন কয়েকটি জোরালো যুক্তি দিয়েছেন, তেমনই দ্রাবিড়দের দাবির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঐতিহাসিক যে যুক্তি দিয়েছেন, তাও কম জোরালো নয়। এই অবস্থায় দ্রাবিড়দের দাবির পক্ষে কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয় । তবে সিন্ধু সভ্যতার নির্মাতা হিসেবে আর্যদের দাবি খুবই দুর্বল বলে মনে হয় । সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে সুমেরীয় বা মেসোপটেমিয়া সভ্যতার বহু সাদৃশ্য আছে বলে অনেকে সুমেরীয়দের এই সভ্যতার সৃষ্টিকর্তা বলে মনে করেন। বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ মার্টিমার হুইলার উভয় সভ্যতার মধ্যে বহু বৈসাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করে সুমেরীয়দের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, সিন্ধুগণ হয়তো সভ্যতার আদর্শ বা ধারণা সুমেরীয়দের কাছ থেকে ধার করেছিল । কিন্তু এই সভ্যতা আসলে ভারতীয়রাই তৈরি করেছিল । অধ্যাপক বাসামও হুইলারকেই সমর্থন করেছেন । বিষয়টি এখনও বিতর্ক স্তরে আছে । তাই এ সম্পর্কে কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসা সম্ভবপর হয়নি । তবে এই সভ্যতা ভারতীয়রাই সৃষ্টি করেছিল বলে মনে হয়।

(৩) সিন্ধু সভ্যতার সময়সীমা [Time Limit of the Harappan Civilisation]: 

সিন্ধু সভ্যতা কবে শুরু হয়েছিল এবং কবে তার ধ্বংস হয়েছিল, এ সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না । মার্শালের মতে, এই সভ্যতার স্থায়িত্বকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৭৫০ অব্দ থেকে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৭৫০ অব্দ । বর্তমানে মার্শালের এই মত অনেকেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন না । পিগো ও হুইলারের মতে, এই সভ্যতার পরিণত পর্যায়ের স্থায়িত্বকাল  খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ । ডি.পি.অগ্রওয়াল, গ্যাড, অলব্রাইট প্রভৃতি পন্ডিতও মোটামুটি একই সিদ্ধান্তে এসেছে । ড. দিলীপকুমার চক্রবর্তী মনে করেন এই সভ্যতার সূত্রপাত খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের মাঝামাঝি এবং শেষ দ্বিতীয় সহস্রাব্দের দ্বিতীয় ভাগে ।

Leave a Comment