সিন্ধু সভ্যতার বৈশিষ্ঠ

 সিন্ধু সভ্যতার বৈশিষ্ঠ [The main features of the Harappan Civilisation]

(১) নাগরিক চরিত্র ও নগর পরিকল্পনা [Urban Culture and Town-Planning] : 

সিন্ধু সভ্যতা নগরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল । এই সভ্যতার প্রধান বৈশিষ্ঠ ছিল উন্নত মানের নগর পরিকল্পনা ও গৃহনির্মাণশৈলী । নগরগুলির মধ্যে হরপ্পা ও মহেন-জো-দরো উল্লেখযোগ্য । নগরগুলির পরিকল্পনা ছিল প্রায় একই ধরনের । নগরগুলি দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল- দূর্গ ও সাধারণ মানুষের জন্য নীচের শহরাঞ্চল । দূর্গগুলি ইটের তৈরি, উঁচু চাতালের উপর অবস্থিত এবং মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল । ফলে শহরে বন্যা হলেও দূর্গে জল ঢুকত না । শাসকশ্রেণি এখানেই বাস করত । মহেন-জো-দরোতে একটি বিশাল স্নানাগার আবিষ্কৃত হয়েছে । এটি উত্তর-দক্ষিণে ১১.৮৯ মি., পূর্ব-পশ্চিমে ৭.০১ মি. এবং গভীরতা ২.৪৪ মি. । জলাশয়ের তিন দিকে খোলা বারান্দা । তারপর ঘর । জলাশয়টিতে জল ভর্তির জন্য একটি ঘরে ইট দিয়ে বাঁধানো কূপ ছিল । পৃথিবীর আর কোথাও এত বড়ো স্নানাগার আবিষ্কৃত হয়নি । আর একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হল ৪৫.৭২ × ২২.৮৬ মি. জায়গা জুড়ে এক শস্যাগার ।

শহরে নগর পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত উন্নতমানের । শহরের রাস্তাগুলি উত্তর-দক্ষিণে এবং পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত ছিল । রাস্তাগুলি প্রায় সোজা ও দশ মিটার চওড়া । ছোট ছোট সরু গলিপথ এইসব রাস্তায় এসে মিশত । রাস্তার দু-ধারে ছিল বড়ো বড়ো তিনতলা পর্যন্ত বাড়ি । আগুনে পোড়া ইট দিয়ে বাড়িগুলি তৈরি হত । সিন্ধুবাসী কাঠের তৈরি দরজা ব্যবহার করত । কিন্তু জানালার কোনো ব্যবস্থা ছিল না । দেওয়ালের উপরে ছিদ্র দিয়ে আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা ছিল । প্রত্যেক বাড়িতে রান্নাঘর ও উঠনের জন্য স্থান সংরক্ষিত ছিল । শহরের গরিব ও খেটে-খাওয়া মানুষ ছোটো ছোটো অস্বাস্থ্যকর কুঁড়েঘরে বাস করত । এইসব এলাকা ছিল বস্তিতুল্য । নগর পরিকল্পনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় শহরবাসীর মধ্যে ব্যপক ধনবৈষম্য ছিল । শহরে জল সরবরাহ ও নিকাশি ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত উন্নত মানের । প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই নিজস্ব কূপ ছিল । তা ছাড়া জনগণের ব্যবহারের জন্য রাস্তাতেও কূপ খনন করা হত । ময়লা জল বার করার জন্য প্রত্যেক বাড়িতেই নর্দমার ব্যাবস্থা ছিল এবং সেই জল রাস্তার বড়ো নর্দমায় পড়ত । রাস্তার ধারে গর্ত করে নর্দমা তৈরি করা হত এবং তা নিয়মিত পরিষ্কার করা হত । অধ্যাপক এ.এল.বাসামের মতে রোমান সভ্যতার আগে অন্য কোনো সভ্যতায় এত উন্নত মানের পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা ছিল না । গবেষক ডি.ডি. কোশাম্বি মনে করেন- উন্নত পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থাই হরপ্পাকে মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা থেকে পৃথক করেছে । অধিকাংশ শহরের পরিকল্পনা প্রায় এক ধরনের হলেও লোথালের বৈশিষ্ঠ হল- এখানে একটি পোতাশ্রয় ছিল।

(২) অর্থনৈতিক জীবন [Economic Life]-

(ক) কৃষি [Agriculture] :

 সিন্ধু সভ্যতা নগরকেন্দ্রিক হলেও অধিকাংশ মানুষ গ্রামে থাকত । কৃষিই ছিল প্রধান উপজীবিকা । গম, জব, সরিষা, তিল প্রভৃতি ছিল প্রধান শস্য । সিন্ধু জনগণ সম্ভবত ধানের চাষ করত না । তবে লোথালে ধানের নিদর্শন পাওয়া গেছে । সিন্ধুনদের বন্যার জল জমিকে উর্বর করত । জলসেচের ব্যাবস্থাও ছিল। অনেকের মতে, তারা লাঙলের ব্যবহার জানত না । এই ধারনা সত্য নয় । কালিবঙ্গানে লাঙল ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া গেছে ।

(খ) পশুপালন [Animal Husbandry]: 

কৃষিকার্যের পাশাপাশি সিন্ধুজনগণ পশুপালন করত । মেষ, গোরু, ছাগল, কুকুর ছিল প্রধান গৃহ পালিত পশু । তারা হাতিকেও পোষ মানাত; তবে ঘোড়ার ব্যবহার জানত কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে । দিলীপকুমার চক্রবর্তী মনে করেন ঘোড়াও গৃহ পালিত জন্তু ছিল । গাধা ও উট ছিল ভারবাহী পশু ।

(গ) ব্যবসাবাণিজ্য [Trade and Commerce] :

 অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য ছিল তাদের উপজীবিকা । মাল পরিবহণের জন্য দু-চাকার গাড়ির ব্যবস্থা ছিল। স্থল ও জল উভয় পথেই ব্যবসা চলত । লোথালে একটি পোতাশ্রয় ছিল । হরপ্পার সঙ্গে মেসোপটেমিয়ার ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল । জলপথে নৌকা ব্যবহার করা হত । তামা, ময়ূর, হাতির দাঁত, চিরুনি, বস্ত্র প্রভৃতি ছিল প্রধান রপ্তানি দ্রব্য । আমদানি হত রুপো ও অন্যান্য ধাতু । সিলমোহর গুলি সম্ভবত বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত হত । তবে সিন্ধু জনগণ মুদ্রার ব্যবহার জানত না । সম্ভবত বিনিময় প্রথার মাধ্যমে কেনাবেচা হত।

(ঘ) কারিগরি শিল্প [Handicraft] :

 শহরের জনগণের একটা বড় অংশ ছিল শিল্পী ও কারিগর । বস্ত্রবয়ন শিল্প ছিল খুবই উন্নত। তাছাড়া অনেক মানুষ মৃৎশিল্প, ধাতুশিল্প ও অলঙ্কার শিল্পেও নিযুক্ত ছিল । সোনা ও রুপো উভয় প্রকারের অলংকারেরই প্রচলন ছিল । গুজরাট ও রাজপুতানা থেকে দামি পাথর আনা হত এবং এগুলি অলঙ্কার নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হত । তাছাড়া কাস্তে, কুঠার, বর্শা, ছুঁচ, ইত্যাদিও তৈরি হত । এই সব দ্রব্য তৈরি করতে তামা ও ব্রোঞ্জ ব্যবহৃত হত । লোহার ব্যবহার সিন্ধু জনগণ জানত না । তবে সিন্ধু সভ্যতার শেষ পর্বে লোথালে লোহার ব্যবহারের কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে । কিন্তু লোহার ব্যাপক প্রচলন ছিল না।

(৩) সামাজিক জীবন [Social Life]:

 সিন্ধু সমাজে ধনবৈষম্য ও শ্রেণিবৈষম্য প্রকট ছিল । সিন্ধু সমাজ বিভিন্ন গোষ্টীতে বিভক্ত ছিল, যথা- পুরোহিত সম্প্রদায়, বণিক, কৃষক, দক্ষকারিগর এবং শ্রমিক । সিন্ধু জনগণের জীবনযাত্রার মান খুব উন্নত ছিল । তাদের প্রধান খাদ্য ছিল গম, যব, তরি-তরকারি ও খেজুর । তা ছাড়া তাদের খাদ্য তালিকায় মাছ, মাংস ও ডিমও অন্তর্ভুক্ত ছিল । সুতিবস্ত্র ছিল তাদের প্রধান পোশাক। শীতের দিনে তারা পশমের পোশাক পরত । নারী-পুরুষ উভয়েই অলংকার পরত । সিন্ধু জনগণ যেসব জিনিস ব্যবহার করত, তার মধ্যে মাটির তৈরি নানা বাসন, যেমন- থালা, জালা, কলসি, বাটি ইত্যাদি প্রধান । কখনো-কখনো এইসব মাটির পাত্রে নানারকম আলপনা আঁকা থাকত । এ ছাড়া তামা, রুপো, ব্রোঞ্জ ও চিনামাটির তৈরি জিনিসপত্রও পাওয়া গেছে । ছুরি, হাতির দাঁত অথবা হাড়ের তৈরি চিরুনি, কাস্তে, কুড়ুল, চারচৌকো পাথর (ওজনের মাপ) ইত্যাদিও ব্যবহৃত হত । সিন্ধু জনগণ লেখাপড়া জানত; যার প্রমান লিপি । সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার অবশ্য আজও হয়নি । সিন্ধু জনগণ মৃত দেহ কবর দিত । তবে কখনও মৃতদেহের কঙ্কাল আবার কখনও মৃত দেহ দাহ করে তার ছাই কবর দেওয়া হত । কবরের মধ্যে মৃতের ব্যবহার্য জিনিসও দেওয়া হত ।

(৪) ধর্মীয় জীবন [Religious Life] : 

সিলমোহরে খোদিত মুর্তি থেকে সিন্ধু জনগণের ধর্মজীবনের আভাস পাওয়া যায় । সিন্ধুজনগণের মধ্যে মাতৃপূজার প্রচলন ছিল । তা ছাড়া যোগাসনে ধ্যানমগ্ন পশুপরিবেষ্টিত তিনমুখবিশিষ্ট একটি পুরুষ দেবমূর্তিও পাওয়া গেছে । এই মুর্তির সঙ্গে শিবের সাদৃশ্য আছে, তাই মার্টিমার হুইলার এই দেবতাকে শিবের পূর্ব সংস্করণ বলে মনে করেন । কয়েকটি শিব লিঙ্গের আবিষ্কার এই অনুমানকে জোরদার করেছে । মূর্তিপূজা ছাড়া শক্তির আরাধ্যরূপে পাথর, গাছ ও জীবজন্তুর পূজাও প্রচলিত ছিল । তবে কোথাও মন্দিরের কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি ।

Leave a Comment