ভারতের রাষ্ট্রপতি

 ভারতের রাষ্ট্রপতি

ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান । রাষ্ট্রপতি ভারতের আইনবিভাগ , শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগের সকল শাখার আনুষ্ঠানিক প্রধান এবং ভারতের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক । ভারতের রাষ্ট্রপতির দণ্ডিত ব্যক্তির দণ্ডাদেশ স্থগিত , হ্রাস বা দণ্ডিতকে মুমা করার অধিকার রয়েছে ।

 রাষ্ট্রপতি এক নির্বাচকমণ্ডলীর দ্বারা পরােক্ষভাবে নির্বাচিত হন । এই নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয় ভারতীয় সংসদ ( লােকসভা ও রাজ্যসভা ) এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের নিয়ে । রাষ্ট্রপতির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর । অতীতে দেখা গিয়েছে যে , শাসক দলের ( লােকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ) মনােনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি হয়েছেন । অনেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন । ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি পুণরায় নির্বাচনে লড়তে পারেন । রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় , যাতে নির্বাচকমণ্ডলীতে প্রতি রাজ্যের জনসংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধায়কদের প্রদত্ত ভােটের সংখ্যা এবং রাজ্য বিধানসভার সদস্যসংখ্যার সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্যসংখ্যার সামঞ্জস্যবিধান করা যায় । কোনাে প্রার্থী এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভােট পেতে ব্যর্থ হলে , একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পরাজয়শীল প্রার্থীদের ভােট অন্য প্রার্থীতে হস্তান্তরিত হতে থাকে এবং সেই সঙ্গে সেই প্রার্থী নির্বাচন থেকে বাদ পড়তে থাকেন , যতক্ষণ একজন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন । ভারতের উপরাষ্ট্রপতি অবশ্য লােকসভা ও রাজ্যসভার সকল সদস্যের ( নির্বাচিত ও মনােনীত ) প্রত্যক্ষ ভােটে নির্বাচিত হন । 

যদিও ভারতীয় সংবিধানের ৫৩ ধারায় বলা হয়েছে যে , রাষ্ট্রপতি তাঁর ক্ষমতা সরাসরি প্রয়ােগ করতে পারেন , তবুও , কয়েকটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতির সব ক্ষমতাই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদের কর্তৃত্বাধীন । ভারতের রাষ্ট্রপতি নতুন দিল্লিতে একটি এস্টেটে বাস করেন । এই এস্টেটটি রাষ্ট্রপতি ভবন নামে পরিচিত । রাষ্ট্রপতির অবসরযাপনের জনা হারুব্রা , শিমলা ও হায়দ্রাবাদে তিনটি রিট্রিট বিল্ডিং রয়েছে । হায়দ্রাবাদের রিট্রিট ভবনটির নাম রাষ্ট্রপতি নিলয়ম । 

২৫ জুলাই , ২০০৭ প্রতিভা দেবীসিংহ পাতিল ভারতের দ্বাদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন । তিনিই দেশের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি ।

 ১৯ জুলাই , ২০১২ ভারতের ত্রয়ােদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে । নির্বাচনের ফল ২২ জুলাই ঘােষিত হয়েছে । প্রণব মুখােপাধ্যায় বিপুল ভােটে জয়লাভ করেছেন । ২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল তাঁর কার্যভার ত্যাগ করেছেন । একই সাথে প্রণব মুখােপাধ্যায় ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন । 

ক্ষমতা ও কর্তব্য 

সংসদীয় 

রাষ্ট্রপতি সংসদের উভয় কক্ষের লােকসভা ও রাজ্যসভা ) অধিবেশন আহ্বান ও প্রত্যাহার করেন । তিনি লােকসভা ভেঙে দিতে পারেন । তবে এই ক্ষমতা তাঁর স্বেচ্ছাধীন নয় , নিছকই নিয়মতান্ত্রিক । এই ব্যাপারে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধিন মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শ মেনে চলতে হয় ।

 প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণটি দেন রাষ্ট্রপতি । বছরের প্রথম সংসদীয় অধিবেশনের প্রথম উদ্বোধনী ভাষণটিও তিনিই দেন । তাঁর এই ভাষণটি আসলে নতুন সরকারি নীতির রূপরেখা মাত্র । 

সংসদে পাস হওয়া প্রতিটি বিল আইনে পরিণত হয় রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে । রাষ্ট্রপতি চাইলে কোনাে বিল ( অর্থবিল বা সংবিধান সংশােধন – মূলক বিল বাদে ) পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন । পুনর্বিবেচনার পর সেই বিলটি সংশােধিত বা অসংশােধিত যে আকারেই রাষ্ট্রপতির কাছে ফিরুক না কেন , তিনি তাতে সাক্ষর করতে বাধ্য থাকেন । তবে তিনি পকেট ভেটো প্রয়ােগ করে বিলটিকে আটকে দিতে পারেন । সেক্ষেত্রে বিলটি আর সংসদেও ফিরে যায় না , রাষ্ট্রপতি – কর্তৃক সাক্ষরিতও হয় না ।

 সংসদের কোনাে কক্ষের অধিবেশনা না থাকলে বা সরকার জরুরি মনে করলে , রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ বা অর্ডিন্যান্স জারি করে অন্তর্বর্তীকালীন আইন চালু করতে পারেন । তবে এই অন্তর্বর্তীকালীন আইনকে পরে সংসদে পেশ করে আইন মােতাবেক পাস করাতে হয় । সংসদে পাস না হলে সংসদের অধিবেশন বসার ছয় সপ্তাহ পরে কোনাে অর্ডিন্যান্সের বৈধতা থাকে না ।

 কার্যনির্বাহী ক্ষমতা 

ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী , কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে রাষ্ট্রপতির হাতে । তিনি লােকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের ( বা জোটের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন । তারপর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে তিনি মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে তাঁদের পাের্টফোলিও বণ্টন করে দেন ।

 মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা রাষ্ট্রপতির সন্তোষে’র ভিত্তিতে তাঁদের পদে আসীন থাকেন । বাস্তব ক্ষেত্রে , অবশ্য মন্ত্রিপরিষদকে লােকসভার সমর্থনের ভিত্তিতে পদে থাকতে হয় । যদি রাষ্ট্রপতি নিজের ইচ্ছামতাে কোনাে মন্ত্রীকে পদচ্যুত করেন , তবে সাংবিধানিক সংকট দেখা যায় । তাই লােকসভার সমর্থন থাকলে মন্ত্রিপরিষদকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় না । 

রাষ্ট্রপতি একাধিক পদাধিকারীকে নিয়ােগ করেন । এঁদের মধ্যে আছেন : 

রাজ্যের রাজ্যপাল ;

 সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টগুলির প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতি ; 

ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল ;

 কম্পট্রোলার ও অডিটার জেনারেল ;

 প্রধান ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার ;

 ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্যবৃন্দ ;

 অন্যান্য দেশে নিযুক্ত অ্যাম্বাস্যাডার ও হাই কমিশনার ;

 রাষ্ট্রপতি অন্যান্য রাষ্ট্রের অ্যাম্বাস্যাডার বা হাই কমিশনারদের কাছ থেকে আস্থাপত্র বা ক্রেডেন্সিয়াল পেয়ে থাকেন । 

রাষ্ট্রপতি ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বা কম্যান্ডার – ইন – চিফ । 

রাষ্ট্রপতি দণ্ডিত ব্যক্তির দণ্ডহ্রাস ( বিশেষত মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ) করতে পারেন ।

 অপরাধীকে ক্ষমা করা সংক্রান্ত অধিকারটি প্রয়ােগ করতে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হয় না বা লােকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠের মত মানতে হয় না । তবে অন্যান্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী ও ক্যাবিনেটের পরামর্শ মানতে হয়।

 অর্থনৈতিক ক্ষমতা

 সকল অর্থবিল একমাত্র তির অনুমােদনক্রমেই সংসদে পেশ করা যেতে পারে । তিনি বার্ষিক বাজেট ও পরিপূরক বাজেট অধিবেশনের আগে সংসদে ভাষণ দেন । তাঁর অনুমােদন ছাড়া সংসদে কোনাে অর্থবিল আনা যায় না । রাষ্ট্রপতি প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটি অর্থ কমিশন গঠন করেন । রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলে তবেই নৈমিত্তিক তহবিল বা কন্টিজেন্সি ফান্ড থেকে টাকা তােলা যায় ।

 বিচারবিভাগীয় ক্ষমতা

রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে এবং প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে অন্যান্য বিচারপতিদের নিযুক্ত করেন । সংসদের দুই কক্ষে কোনাে বিচারপতির অপসারণের পক্ষে প্রস্তাব দুই – তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভােটে পাস হলে , তবেই রাষ্ট্রপতি সংশ্লিষ্ট বিচারপতিকে অপসারিত করতে পারেন । 

রাষ্ট্রপতি কোনাে ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণ মকুব করতে পারেন , সাময়িকভাবে হ্রাস করতে পারেন , বিশেষ ক্ষেত্রে মুলতুবি করতে পারেন , বা লঘু করতে পারেন । অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি দণ্ডের চরিত্র না বদলে একটির বদলে অপর দণ্ডের ব্যবস্থা করতে পারেন । 

রাষ্ট্রপতি কয়েকটি বিচারবিভাগীয় সুবিধা ভােগ করেন :

কার্যকালে তাঁর বিরুদ্ধে কোনাে ফৌজদারি মামলা জারি করা যায় না ।

তিনি তাঁর কাজের জন্য আদালতে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন না । 

কূটনৈতিক ক্ষমতা

 সব আন্তর্জাতিক সনদ ও চুক্তি রাষ্ট্রপতির নামে সাক্ষরিত হয় । যদিও সনদ বা চুক্তির ব্যাপারে যাবতীয় আলােচনা চালান প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর ক্যাবিনেট ( বিশেষত বিদেশমন্ত্রী ) । তাছাড়া এই সব সনদ ও চুক্তিকে সংসদে পাস করাতে হয় । সেই সব আন্তর্জাতিক ফোরাম ও অন্যান্য বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন , যেগুলি মূলত নামসর্বস্ব । রাষ্ট্রপতি ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিস – এ কর্মরত ও অন্যান্য কূটনীতিকদের সঙ্গে মতামত আদানপ্রদান করতে পারেন । রাষ্ট্রপতি দেশের প্রথম নাগরিক । 

সামরিক ক্ষমতা 

রাষ্ট্রপতি ভারতের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক । তিনি যুদ্ধঘােষণা ও শান্তিঘােষণা করতে পারেন । তবে সামরিক বাহিনীর প্রধানগণ , সামরিক সচিব ও রাষ্ট্রপতির সামরিক উপসচিবের মধ্যে আলোচনাক্রমে সংসদের অনুমােদনক্রমেই তিনি তা করতে পারেন । সব সামরিক চুক্তি তাঁর নামে সাক্ষরিত হয় । 

ক্ষমা – সংক্রান্ত ক্ষমতা 

ভারতীয় সংবিধানের ৭২ নং ধারা অনুযায়ী , রাষ্ট্রপতি নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলিতে অপরাধীকে ক্ষমা করার অধিকারী : 

কেন্দ্রীয় আইনে অপরাধী সাব্যস্তদের ক্ষেত্রে

সামরিক আদালতে অপরাধী সাব্যস্তদের ক্ষেত্রে

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে । 

জরুরি অবস্থা ঘােষণার ক্ষমতা

 রাষ্ট্রপতি তিন ধরনের জরুরি অবস্থা ঘােষণা করতে পারেন ; জাতীয় , রাজ্য ও অর্থনৈতিক ।

 জাতীয় জরুরি অবস্থা 

যুদ্ধ , বহিরাক্রমণ বা সশস্ত্র বিদ্রোহের ক্ষেত্রে সমগ্র ভারতে বা ভারতের অংশবিশেষে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘােষণা করা যায় । এই রকম জরুরি অবস্থা ঘােষিত হয়েছিল ১৯৬২ ( ভারত – চীন যুদ্ধ ) , ১৯৭১ ( ভারত – পাকিস্তান যুদ্ধ ) , ১৯৭৫-৭৭ ( ” আভ্যন্তরিন গােলমাল ” -এর প্রেক্ষিতে ইন্দিরা গান্ধী কর্তৃক ঘােষিত ) সালে । 

সংবিধানের ৩৫২ নং ধারা অনুসারে , কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের লিখিত অনুরােধেই রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন । তবে এই ঘােষণা এক মাসের মধ্যে সংসদে পাস করাতে হয় । ছয় মাসের জন্য জরুরি অবস্থা ঘােষণা করা যায় । তবে সংসদের অনুমােদনক্রমে তা ছয় মাস ছয় মাস করে মােট ৩ বছর পর্যন্ত বাড়ানাে যায় ।

এই জাতীয় জরুরি অবস্থা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রদ করা যায় । স্বাধীনতার অধিকারের অন্তর্গত ছয়টি অধিকারও স্বাভাবিকভাবেই রদ হয় । যদিও জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার খর্ব করা যায় না ( ধারা ২১ ) ।

রাষ্ট্রপতি রাজ্যতালিকার ৬৬ টি বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে পারেন । তাছাড়া , অর্থবিল রাষ্ট্রপতির অনুমােদনের জন্য পাঠানাে হয় । জরুরি অবস্থার সময় লােকসভার মেয়াদ এক বছর পর্যন্ত বাড়ানাে যায় । তবে তা এমনভাবে বাড়ানাে যায় না , যাতে তা জরুরি অবস্থা সমাপ্তির পর ৬ মাসের বেশি কার্যকর থাকে ।

 রাষ্ট্রপতি শাসন 

কোনাে রাজ্যে সাংবিধানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সেই রাজ্যে রাজ্যস্তরে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় । একে বলে রাষ্ট্রপতি শাসন ।

 রাজ্যপালের প্রতিবেদন বা অন্য কোনাে সরকারি সূত্র থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন যে , কোনাে রাজ্য সাংবিধানিক পথে রাজ্য পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়েছে , তাহলে তিনি সেই রাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি করেন । তবে এই ব্যবস্থাটিকে দুই মাসের মধ্যে সংসদের অনুমােদন নিতে হয় ।

ভারতীয় সংবিধানের ৩৫৬ ধারার অধীনে কমপক্ষে ছয় মাস থেকে অনধিক তিন বছর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসন জারি রাখা যায় । রাষ্ট্রপতি শাসনের স্বাভাবিক মেয়াদ ছয় মাস । কিন্তু এই মেয়ার ছয় মাস করে অনধিক তিন বছর পর্যন্ত বাড়ানাে যায় । তার বেশি সময় রাষ্ট্রপতি শাসনের মেয়ার বাড়াতে হলে সংবিধান সংশােধন করা প্রয়ােজন । পাঞ্জাব ও জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে তা করা হয়েছিল । 

এই ধরনের জরুরি অবস্থার সময় রাষ্ট্রপতি রাজ্যের শাসনবিভাগের যাবতীয় দায়িত্ব নেন এবং রাজ্যপাল রাষ্ট্রপতির হয়ে রাজ্য পরিচালনা করেন । বিধানসভা হয় ভেঙে দেওয়া হয় , নয়তাে অকার্যকর থাকে । এই সময় সংসদ রাজ্য তালিকার ৬৬ টি বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে পারে । সব ধরনের অর্থবিল রাষ্ট্রপতির অনুমােদনের জন্য পাঠানাে হয় । 

নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে ।

 ৩৫৬ ধারা – রাজ্যে যদি সাংবিধানিক শাসনকাঠামাে ভেঙে পড়ে । 

৩৬৫ ধারা – রাজ্য যদি কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ মেনে কাজ করতে ব্যর্থ হয় । 

এই ধরনের জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে ২ মাসের মধ্যে সংসদের অনুমতি নিতে হয় । এই ধরনের জরুরি অবস্থা ৬ মাস করে বাড়াতে বাড়াতে ৩ বছর অবধি জারি রাখা যায় । যদিও দুটি কারণে এক বছরের মধ্যেই এই জরুরি অবস্থা আরও বাড়ানাে যায় , যদি— 

দেশে বা নির্দিষ্ট রাজ্যে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি হয় ।

নির্বাচন কমিশন সেখানে নির্বাচন পরিচালনা করা কষ্টকর মনে করেন । 

২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ভারতে শেষবারের মতাে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয় ঝাড়খণ্ড রাজ্যে । 

অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা

 রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন যে , ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা বিপন্ন হচ্ছে , তবে তিনি সংবিধানের ৩৬০ ধারার অধীনে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা ঘােষণা করতে পারেন । এই ধরনের জরুরি অবস্থাও দুই মাসের মধ্যে সংবিধান কর্তৃক অনুমােদিত হতে হয় । ভারতে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা একবারও জারি করা হয়নি । দেশের আর্থিক অবস্থা বিপন্ন হলে ভারতের স্বর্ণ সঞ্চয় বিক্রয় করে জরুরি অবস্থা এড়ানাে হয়েছে ।

 অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক এই ব্যবস্থা প্রত্যাহৃত না করা অবধি অনির্দিষ্টকালের জন্য জারি থাকে ।

এই সময় রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতি সহ সব সরকারি আধিকারিকের বেতন কমিয়ে দিতে পারেন । রাজ্য বিধানসভার সব অর্থবিল রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে অনুমােদিত করাতে হয় । রাষ্ট্রপতিও রাজ্যগুলিকে কিছু কিছু অর্থনৈতিক নীতিনির্দেশনার ব্যাপারে নির্দেশ দিতে পারেন । 

নির্বাচন প্রক্রিয়া

 যােগ্যতা 

সংবিধানের ৫৮ ধারায় রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর যােগ্যতার উল্লেখ করা হয়েছে । রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর নিচের যােগ্যতাগুলি থাকা প্রয়ােজন :

 তাঁকে ভারতের নাগরিক হতে হয় ।

 তাঁর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হতে হয় । 

 তাঁর লােকসভা প্রার্থী হওয়ার যােগ্যতা থাকা প্রয়ােজন।

 ভারত সরকার বা কোনাে রাজ্য সরকার বা কোনাে স্থানীয় বা অন্য কর্তৃপক্ষের অধীনস্থ লাভজনক পদে আসীন ব্যক্তিরা রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী হতে পারেন না ।

 তবে নিম্নোক্ত কয়েকজন পদাধিকারী রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী হতে পারেন :

ক্ষমতাসীন উপরাষ্ট্রপতি ।

কোনাে রাজ্যের রাজ্যপাল । 

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ( প্রধানমন্ত্রী সহ ) ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী

 তবে এই পদাধিকারীদের কেউ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে , রাষ্ট্রপতি হিসেবে কার্যভার গ্রহণের দিনের মধ্যেই তাঁদের পূর্বতন পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয় । 

১৯৫২ সালের রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী , রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর নাম নির্বাচক মণ্ডলীর ৫০ জন দ্বারা প্রস্তাবিত ও ৫০ জন দ্বারা সমর্থিত হতে হয় । তবেই তাঁর নাম ব্যালেটে মুদ্রিত হয় ।

 ভেটো ক্ষমতা

 সাংবিধানিকভাবে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি অনেকগুলাে ভেটো ক্ষমতা প্রয়ােগের অধিকারী । রাষ্ট্রপতি যে – কোন বিলে সম্মতি প্রদান বা স্বাক্ষর না – ও করতে পারেন যা অবশ্যম্ভাবী ভেটো হিসেবে পরিচিত । ভেটো প্রয়ােগের ফলে তিনি বিলকে পুণরায় সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন । এ সীমিত আকারের ভেটোকে পাশ কাটানাের জন্যে সংসদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে উতরানাে সম্ভব । এছাড়াও রাষ্ট্রপতি অনির্দিষ্টকালের জন্যে বিলের উপর কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যা কখনাে কখনাে পকেট ভেটো নামে পরিচিত ।

Leave a Comment