ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদহিন্দ ফৌজ এর ভূমিকা লেখ।। উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস 2021 বড় প্রশ্ন সাজেশন

ভূমিকা→

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আবির্ভাব ঝলসে ওঠা এক উন্মুক্ত তরবারির মতো। তার মতো তীক্ষ্ণ প্রতিভাবান, বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন এবং নির্ভিক যোদ্ধা  ভারতের ইতিহাসে খুবই বিরল। আজাদ হিন্দ ফৌজ এর সর্বাধিনায়ক হিসাবে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস তার শেষ নির্দেশনায় ঘোষণা করেছিলেন, ” পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই যা ভারত কে পদানত করে রাখে, ভারত স্বাধীন হবে, তা হবে অনতি কালের মধ্যে”।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজি→ 

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে আমরা তিনটি ধারা লক্ষ্য করি।

(i) গান্ধীজীর নেতৃত্বে অহিংস অ-সহযোগ আন্দোলন

(ii) সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদে ভারতীয় বিপ্লবীদের আন্দোলন।

(iii)  বিদেশি শক্তির সাহায্যে ব্রিটিশ উচ্ছেদ মূলক আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম।

সুভাষচন্দ্র বোস এর উত্থান→ উড়িষ্যার কটক শহরে এক অভিজাত পরিবারে 1897 খ্রিস্টাব্দে 23 শে জানুয়ারি সুভাষচন্দ্র বোস জন্মগ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব প্রকাশ করার জন্য তাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে তিনি স্নাতক হন। আইসিএস (ICS) পরীক্ষায় তিনি চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। তিনি কংগ্রেসের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। তিনি হরিপুরা কংগ্রেস সভাপতি হন এবং ত্রিপুরা কংগ্রেসে তিনি পুনরায় সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু গান্ধীজীর সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায়, কংগ্রেসের অভ্যন্তরে যারা বামপন্থী নামে পরিচিত ছিল তাদের সহযোগিতায় নেতাজি 1939 খ্রিস্টাব্দে 3 রা মে  ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেন।

সুভাষ চন্দ্রের ভারত ত্যাগ→ নেতাজি চেয়েছিলেন ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে এবং ব্রিটিশ সরকারও এটি বুঝতে পেরে তাকে কলকাতা এলগিন রোডে নিজ বাসভবনে বন্দি করে রাখেন। 1941 খ্রিস্টাব্দে 17 ই জানুয়ারি নেতাজি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে গৃহ ত্যাগ করে এবং সেখান থেকে তিনি কাবুল পোঁছান।

জার্মানিতে সুভাষচন্দ্র→ কাবুল থেকে সুভাষচন্দ্র মস্কো যান এবং সেখান থেকে তিনি বার্লিন এ গিয়ে পৌঁছান। বার্লিনে বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি ভারতীয় জনগণের উদ্দেশ্যে একটি দেশাত্মবোধক ভাষণে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানান। জার্মানি প্রবাসী ভারতীয়রা তাকে ‘নেতাজি‘ আখ্যায় ভূষিত করে।

জাপানে সুভাষচন্দ্র→ সুভাসচন্দ্র উপলব্ধি করেছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে কোন দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা সহজ হবে, এই উদ্দেশ্যে 1943 খ্রিস্টাব্দে নেতাজি জাপানে পৌঁছান। সেখানে বিপ্লবী রাজবিহারী বসু জাপানের হাতে বন্দি ভারতীয় সৈনিক দের নিয়ে একটা সেনা বাহিনী গঠন করেছিলেন এবং রাজবিহারী বসু সেই সেনা বাহিনীর দায়িত্ব নেতাজির হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্র ওই বাহিনীর নাম রেখেছিলেন ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’

সুভাষচন্দ্র ও আজাদ হিন্দ ফৌজ→ 

নেতাজির নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ দেশপ্রেমবোধে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠে। 

                     1943 খ্রিস্টাব্দে 21 শে অক্টোবর নেতাজি সিঙ্গাপুরে জাপানি সরকারের অনুমোদন ও সহযোগিতায় আজাদ হিন্দ সরকার গঠন করে। পরে 1944 খ্রিস্টাব্দে আজাদ হিন্দ ফৌজ সরকার গঠন করেন এবং তার কর্ম কেন্দ্র রেঙ্গুনে স্থানান্তর করে।

                       নেতাজি ভারতে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেন করার উদ্দেশ্যে আরাকান সীমান্ত ও মনিপুর পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। 1944 খ্রিস্টাব্দে 15 এপ্রিল আজাদ হিন্দ বাহিনী বাহিনী কহিমা শহর অধিকার করে এবং সর্ব প্রথম ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

                        সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ বাহিনীকে পাঁচটি বিগ্রেড এ ভাগ করেছিলেন।

(1) গান্ধী বিগ্রেড

(2) সুভাষ বিগ্রেড

(3) নেহেরু বিগ্রেড

(4) আজাদ বিগ্রেড

(5) ঝাঁসি রানী বিগ্রেড

ঝাঁসি রানী বিগ্রেড এ অনুমোদন দিয়েছিলেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন। কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই মার্কিন ও ব্রিটিশ বাহিনী প্রচেষ্টায় আজাদ হিন্দ ফৌজ এর ভারত উদ্ধারের চেষ্টা ব্যার্থ হয়। বাধ্য হয়ে নেতাজি আজাদ হিন্দ সরকারের কর্মকাণ্ড রেঙ্গুন থেকে স্থানান্তর করে ব্যাংককে নিয়ে যান। অবশেষে আজাদ হিন্দ ফৌজ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন এবং বলা হয়ে থাকে 1945 খ্রিস্টাব্দে 18 ই অক্টোবর নেতাজি জাপানে যাওয়ার সময় বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। এইভাবে নেতাজির নেতৃত্বে বহিরাগত শক্তির সহযোগীতায় ভারতে স্বাধীনতা লাভের সশস্ত্র প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

ব্যর্থতার কারণ→

(1) প্রাকৃতিক বিপর্যয় এর ফলে দুর্গম পাহাড় ঘেরা এলাকায় আজাদ হিন্দ ফৌজ যথাযথভাবে যুদ্ধ করতে পারেননি।

 (2) আসলে জার্মানিও যথাযথ ভাবে সাহায্য করতে পারেনি। যুদ্ধের জন্য জার্মানিদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভূল হয়েছিল।

গুরুত্ব→

(1) আজাদ হিন্দ ফৌজ এর সাহায্যে বাইরে থেকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দুঃ-সাহসী প্রচেষ্টা ব্যার্থ হলেও তা ভারতের স্বাধীনতা লাভ কে ত্বরান্বিত করেছিল।

(2) আজাদ হিন্দ সরকার গঠনের মাধ্যমে তিনি ভারতে স্বাধীনতা প্রশ্নটিকে আন্তরর্জাতিক রাজনীতির পটভূমিতে তুলে ধরেছিলেন।

 মূল্যায়ন→

 গান্ধীজীর মতে সুভাষচন্দ্র বোস জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে পতাকার তলে আনতে পেরেছিলেন। মাইকেল অডোয়ার্স তার ‘LAST YEAR OF BRITISH’ গ্রন্থে বলেছেন, “হ‍্যেমলেটের বাবার মতো সুভাষচন্দ্রের প্রেত-আত্মা লালকেল্লার এলাকায় ঘুরছিল এবং হঠাৎ তা বৃহৎ আকার মূর্তি ধারণ করে সভাপক্ষে যে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল তা স্বাধীনতার অগ্রসরকে সহজ করেছে”

Leave a Comment